চিটফান্ড;এক নিরুপায় মানুষের গল্প

চিটফান্ড;এক নিরুপায় মানুষের গল্প

আমিওতো প্রতারিত



তো রীতিমত গিয়ে আমি সব করলাম। সঞ্জয়দা ডাক দিল, "তুমি সব রীতিনীতি জানো তো ? তোমাকে মাসে একটা টার্গেট দেওয়া হবে, এত টাকা জমা করতে হবে। তুমি যেমন দ্বিগুণ টাকা পেয়েছ, তেমন লোকদেরকে বোঝাতে হবে। এজন্য তোমাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তার জন্য তোমাকে কিন্তু এখানে কিছুদিন থাকতে হবে। আমি তো বেজায় খুশি হয়ে বললাম, " অবশ্যই থাকবো।" সেদিন বাড়ি গিয়ে রুম্পা কে সব ব্যাপারটা বললাম। রুম্পা শুনে খুব খুশি হলো। তারপর দিন থেকে আমার ট্রেনিং চালু হলো। এক সপ্তাহ চলল। কি করে লোককে বোঝাতে হবে, কি বলতে হবে সব কিছুই বলল। এটাও বলে দিল আমাদের লক্ষ্য লোকের সাহায্য করা। আমরা বড়লোক দের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গরীবদেরকে দিই, এভাবে আমাকে বলতে লাগলো। আমি অত চালাক চতুর নই, ভাবলাম যদি আমি কিছু সাহায্য করতে পারি তো করব। এই কথা ভেবে তারপর থেকে শুরু করলাম আমি প্রচার। গ্রামে এসে অনেক কে বললাম। ব্যাপারটা শুনে অনেকেই রাজি হলো। সেই মাসে আমি দু লাখ টাকা কোম্পানিতে জমা দিলাম। কোম্পানির লোক খুব খুশি হল যে আমি এক মাসে এত টাকা জমা দিয়ে দিলাম। তিন চার মাসে আমি বেশ ১০ লাখ টাকা কোম্পানিতে জমা দিয়ে আমি খুব খুশি। এর মধ্যে আমি শরীর খারাপ এ পড়ি। এক সপ্তাহ অফিস যেতে পারিনি। হঠাৎ একদিন টিভি খুলে দেখি আমাদের কোম্পানির নিয়ে বলছে। টিভিতে বলছে নাকি এটা প্রতারক কোম্পানি। সবাইকার কাছ থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। কথাটা শুনে আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। রুম্পা শব্দটা শুনে দৌড়ে এলো। "কি হয়েছে গো ? কি হয়েছে ? পড়ে গেলে কেন ?" "আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি রুম্পা। কি করবো এবার ?" "এত ভেঙে পড়লে চলবে ? কিছু না কিছু ব্যবস্থা ঠিক বেরিয়ে আসবে।" আমি তাড়াতাড়ি বর্ধমান এ গেলাম। দেখলাম অফিসের সামনে হাজার হাজার মানুষ ধর্নায় বসেছে। কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না কি করব। রবিকে কল করি। ওর ফোন কিন্তু লাগে না। মনে মনে ভাবলাম বন্ধু হয়ে তুই পিঠে এতটা আঘাত করলি। হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। রুম্পা দরজাটা খুলে বলল, "কি গো, কিছু খবর পেলে ?" "না। আমার সব টাকা জলে চলে গেছে। লোকের জমানো টাকাগুলোও সব জলে চলে গেছে। রিতা ঘুমিয়ে পড়েছে ?" "না। ও পড়ছে। ওর কাল পরীক্ষা। তবে কিছু বলার দরকার নেই।" তার পরদিন সকাল সকাল দোকান খুলি। হঠাৎ রামুদা আমার দোকানে এসে বলল তোমাকে যে আমি এত টাকা দিয়েছি, আমার টাকা ফেরত দাও। আমি রামুদাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম কিন্তু বুঝলো না। আমার সাথে মারপিট হয়ে গেল। ইতিমধ্যে পাড়ার সবাই ব্যাপারটা জেনে গেছে। সবাই আমাদের নামে কটূক্তি শুরু করেছে। যারা আমাকে সম্মানের চোখে দেখত, তাদের কাছে আমি একজন প্রতারক। কি করব আমি ঠিক জানিনা। শংকর তো আমাকে জানে মারার হুমকি দিয়ে দিল, "আমার টাকা ফেরত না দিলে তোর মেয়েকে রেপ করে দেব।" সব শুনতে হলো নির্বাক শ্রোতা হয়ে। বাড়িতে ফিরলাম। "এরপর কি করা যায় রুম্পা ?" "প্রথমে আমাদের যা টাকা-পয়সা আছে তা দিয়ে যতজনের পারো তাদের টাকা শোধ করে দাও। তারপরে বাকিটা না হয় দেখা যাবে ।আমার স্ত্রীয়ের সোনা দানা, আমার দোকান বিক্রি করে কে ৩ লাখ টাকা পেলাম। শংকর কে আর রামুদাকে দিয়ে ওদের চুপ করালাম। এরপর আরো ৭ লাখ টাকা দিতে হবে। কোথা থেকে পাব কে জানে ! অবশেষে আমাদের বাড়িটা বিক্রি করে আরো চার লাখ টাকা যোগাড় করলাম। আমরা ফুটপাতে নেমে গেছি। মেয়েটার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রাম থেকে দূরে একটা বাড়িতে আমরা আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি। গ্রামে থাকলে তো লোকেরা আমাকে মেরে ফেলবে, আমাদেরকে আগুন লাগিয়ে দেবে। এই খারাপ সময়ে কখনো ভুলতে পারবো না। কেউ পাশে থাকেনি। সবার যেমন টাকা গেছে তার জন্য সবাই আমাকে দায়ী করছে, কিন্তু আমিও যে তাদের মত প্রতারিত কেউ তা বুঝতে পারছে না। এই করতে করতে একটা মাস পেরিয়ে গেল। রোজ লোকে আমাকে খোটা দিতে একদিন বাধ্য হয়ে সুইসাইড করব ঠিক করি। হঠাৎ রুম্পা আমাকে দেখে নেয়। গলা জড়িয়ে বলে, "ওগো কি করছো ? তুমি চলে গেলে আমাদের কি হবে ? ভগবান যখন এই পরিস্থিতিতে ফেলেছে ঠিক নিশ্চয়ই কিছু না কিছু উপায় বের করবে। তুমি বরং কাল বাবার বাড়ি গিয়ে দাদার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসো। ওটা দিয়ে না হয় একটা ব্যবসা শুরু করব। আরতো মাত্র ৩ লাখ টাকা বাকি।" পরদিন সকালে আমি বর্ধমান এ গেলাম। সেই অফিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। মনটা কেঁদে উঠলো। শ্বশুর ঘর গেলাম। দাদা সবই জানে। বলল, "এই নাও কিছু টাকা। বোন আমাকে বলেছে। আমরা আছি তোমার সাথে। ভয় কেন পাচ্ছ। কিছুক্ষণ থেকে বাড়ি ফিরে এলাম। "এই নাও তোমার কথা মতো টাকা তো নিয়ে এলাম, এরপর কি করবে ?" "তুমি কলকাতা থেকে কিছু জিনিস নিয়ে এসো। আমরা দুজন মিলে তা বিক্রি করব। এভাবে আমি কলকাতা গিয়ে কিছু জিনিস নিয়ে এলাম। রুম্পা আর আমি মিলে একটা ব্যবসা শুরু করলাম। আস্তে আস্তে সব টাকা শোধ হয়ে গেল। আবার আমরা সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শুরু করলাম। ওই যে সময়টা আমাদের পেরিয়েছে আমি কখনোই ভুলতে পারবো না। সবার যেমন টাকা গেছে আমারও তো গেছে। সবাই আমাকে দোষ দেয় কিন্তু আমিও যে তাদের মত প্রতারিত এটা কিন্তু কেউ বোঝে না। - একতথাকথিত "প্রতারকের" সত্যি ঘটনার স্বীকারোক্তি।। Thank you

Comments